Sunday, November 20, 2016

সত্যি সত্যি হিন্দু শূণ্য হচ্ছে বাঙলাদেশ !

সংরক্ষিত পোস্ট- https://www.istishon.com


ঢাকা বিশ্ববদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারাকাত-এর এক গবেষণায় জানা গেছে ১৯৬৪ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৫ দশকে মোট ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দু ধর্মাবলম্বি মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ২ লাখ ৩০ হাজার ৬১২ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বি মানুষ নিরুদ্দিষ্ট বা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। আর প্রতিদিন দেশ ছেড়েছেন গড়ে ৬৩২ জন হিন্দু। এই পরিসংখ্যান মহান মুক্তিযোদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত লজ্জা জনক। হিন্দুদের এই দেশত্যাগ মুক্তিযোদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, হিন্দুদের দেশত্যাগের এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী তিন দশকে বাঙলাদেশ সম্পুর্নভাবে হিন্দু শূণ্য হয়ে যাবে। অবশ্য এই ধারা অব্যাহত থাকবে, না কি আরও বিপুল গতিতে বেড়ে গিয়ে তিন দশকের পরিবর্তে এক দুই দশকেই দেশ হিন্দু শূণ্য হয়ে যাবে তাও ভেবে দেখবার বিষয়।
হিন্দুদের দেশত্যাগের ধারাটি যে দিন কে দিন বেড়ে চলছে তাও এই গবেষণায় স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। গবেষণাটিতে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়কালে প্রতিদিন গড়ে নিরুদ্দেশ হওয়া হিন্দুদের সংখ্যা সমান নয়, যেমন-১৯৬৪ থেকে ১৯৭১ পাকিস্তানের শেষ ৭ বছর প্রতিদিন নিরুদ্দেশ হয়েছেন ৭০৫ জন হিন্দু। ১৯৭১ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন নিরুদ্দেশ হয়েছেন ৫২১ জন। ১৯৮১ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন নিরুদ্দেশ হয়েছেন ৪৩৮ জন। ১৯৯১ থেকে ২০০১ পর্যন্ত প্রতিদিন ৭৬৭ জন হিন্দু দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। আর ২০০১ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ৬৭৪ জন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ দেশ থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছেন।
অধ্যাপক আবুল বারাকাতের মতে, এটি একটি ভয়ঙ্কর ব্যাপার যে এই দেশে জন্ম নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া। তিনি বলেন, যেভাবে হিন্দুরা হারিয়ে যাচ্ছে, তাতে এই নিরুদ্দেশ প্রক্রিয়ার প্রবণতা বজায় থাকলে আগামী দুতিন দশক পরে এদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বী কোনও মানুষ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ড. বারকাত তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, অর্পিত সম্পত্তি নামে শত্রু সম্পত্তি আইন কার্যকর থাকার ফলে হিন্দু হিন্দুধর্মাবলম্বী মানুষ অনিচ্ছায় দেশান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছেন।
তার গবেষণায় বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সামন্ত-সেনা শাসকরা জন্ম সূত্রেই ছিলেন বাংলা ভাষা ও বাঙালি বিরোধী। যে কোনও কায়দায় ব্যাপক হিন্দু জনগোষ্ঠীকে সম্পদচ্যুত, ভূমিচ্যুত, দেশচ্যুত করা গেলে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতিকে বিভক্ত করে শাসন করা সোজা হবে। এ ভাবনা থেকেই পাকিস্তানি সেনা শাসকরা ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে শত্রু সম্পত্তি আইন জারি করে।
আবুল বারকাতের গবেষণায় দেখা গেছে, শত্রু সম্পত্তি আইনে হিন্দু সম্প্রদায়ের মূল মালিকানার ২৬ লাখ একর বেদখল বা ভূমিচ্যুত করা হয়েছে। এই ২৬ লাখ একরের মধ্যে প্রায় ৮২ শতাংশই কৃষি জমি, ২৯ শতাংশ বসতভিটা, ৪ শতাংশ বাগান, ৩ শতাংশ পতিত, ১ শতাংশ পুকুর ও ১৯ শতাংশ অন্যান্য জমি বেদখল হয়েছে।
আবুল বারকাত তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, শত্রু অর্পিত সম্পত্তি আইনে ভূমি-জলা ও স্থানান্তরযোগ্য সম্পদ হারানোর আর্থিক ক্ষতি সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা (২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজার দর হিসাবে)।
গবেষণায় বলা হয়েছে, গত ৪০ বছরে (১৯৬৫-২০০৬) বিভিন্ন সরকারের আমলে শত্রু ও অর্পিত সম্পত্তি আইনে হিন্দুধর্মাবলম্বী মানুষের ক্ষতির পরিমাণ ও মাত্রা ছিল বিভিন্ন ধরনের। এই আইনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ৬০ শতাংশ ও মোট ভূমিচ্যুতির ৭৫ শতাংশ হয়েছে ১৯৬৫ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। মোট ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ২০ দশমিক ৬ শতাংশ ও মোট ভূমিচ্যুতির ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ ঘটেছে ১৯৭৬ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, শত্রু ও অর্পিত সম্পত্তি আইনে যেসব হিন্দুধর্মাবলম্বী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের ৭২ শতাংশ এবং মোট ভূমিচ্যুতির ৮৮ শতাংশই ঘটেছে সেনাশাসন-স্বৈরশাসনামলের ২১ বছরে। অর্থাৎ ১৯৬৫ থেকে ১৯৭১ সাল এবং ১৯৭৬ থেকে ১৯৯০ সাল।
ড. বারকাত তার গবেষণায় দাবি করেছেন, হিন্দু সম্প্রত্তি বেদখল করতে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও ভূমি অফিস সবচেয়ে দায়ী। গবেষণায় বলা হয়েছে, সম্পদ দখল হয়েছে প্রধানত ৫ ভাবে। প্রথমত- স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ভুমি অফিসের সঙ্গে যোগসাজশে উদ্দেশ্য সাধন করেছেন (৭২ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্তের বক্তব্য)। দ্বিতীয়ত-ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা নিজেরাই অবৈধ দখল করেছেন (৪৬ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্তের বক্তব্য)। তৃতীয়ত- স্থানীয় প্রভাবশালী মহল বিভিন্ন ধরনের বল প্রয়োগ করেছেন, জোরপূর্বক বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছেন, দেশত্যাগে বাধ্য করেছেন (৩২ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্তের বক্তব্য)। চতুর্থ কারণ হলো, প্রকৃত মালিক/ উত্তরাধিকারীদের একজনের মৃত্যু অথবা দেশত্যাগ (৩৫ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্তের বক্তব্য) এবং পঞ্চম কারণ, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল জাল দলিল-দস্তাবেজ, কাগজপত্র তৈরি করে ভূসম্পত্তি দখল করেছেন (১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্তের বক্তব্য)।
ড. বারকাত তার গবেষণায় বলেছেন, ‘শত্রু/অর্পিত সম্পত্তি আইন’ বিষয়টি কোনও অর্থেই হিন্দু বনাম মুসলমান সমস্যা নয়। বরং বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে বলপূর্বক অন্যের সম্পত্তি দখল করার একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া মাত্র। যে প্রক্রিয়ায় লুটপাটের ভাগিদার হয় গুটিকয়েক প্রভাবশালী ব্যাক্তি/শ্রেনি/ গোষ্ঠী।
তবে ড. বারকাতের গবেষণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পিযুষ কান্তি ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘ভারতে অনেক হিন্দু বেড়াতে যায়। কিন্তু সেখানে বসবাস করতে যাবে, এমন মনোভাব অনেকেরই নেই। এ কারণে অধ্যাপক আবুল বারকাতের ওই গবেষণার সঙ্গে আমি একমত নই। তিনি বলেন, ‘হয়তো কোনও হিন্দু মনে করেছে, সেখানে তাদের বসবাস করা অসম্ভব। তবে সব হিন্দু কিন্তু এমনটি মনে করে না। এই দেশে বহু হিন্দু আছে, যারা এই দেশ ছেড়ে কখনই যাবে না।’
এ কথা বলার কোন অবকাশ নেই যে অধ্যাপক আবুল বারাকাতের গবেষণা শতভাগ নির্ভুল নয়, বরং বর্তমান সময়ে আমরা বাঙলাদেশের যে চিত্র দেখি, বাঙালী মুসলমানদের যে মনোভাব দেখি, তাতে তাঁর গবেষণায় বরং ঘাটতিই আছে বলা যায়। তিন দশকের আগেই হিন্দু শূণ্য হয়ে যাবে বাঙলাদেশ। অথচ জনাব পিযুষ কান্তি অবলীলায় মূল সত্যকে আড়াল করার জন্য উদ্ভট বেড়ানোর থিউরি দিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য চাড়ালেরা সত্য আড়াল করতে বরাবইর ওস্তাদ।

Sunday, November 13, 2016

গল্পঃ জীবনের গল্প (ইসমাত আরা)

গল্পঃ জীবনের গল্প
লেখকঃ ইসমাত আরা

নীলা নামে ১৭ বা ১৮ বছরের একটা সুন্দরী মেয়ে আমাদের অফিসে জয়েন করেছে আজ থেকে প্রায় সাত বা আট মাস আগে। ওর কাজ হচ্ছে অফিস পরিষ্কার করা, ব্যাংকে যাওয়া ও বাইরের কাজগুলো করা। খুব সুন্দর সুন্দর পোশাক পরে আসে। মিয়ানমারের মেয়ে। প্রথম যেদিন দেখলাম ওর সঙ্গে একটু কথা বললাম। বাড়িতে কে কে আছে, কত দিন হলো ব্যাংককে এসেছে, কোথায় থাকে ইত্যাদি। খুব ভালো লাগল।
প্রতিদিন সকালে যখন দেখা হয় জিজ্ঞাসা করি, কিছু খেয়েছ সকালে? কোনো দিন উত্তর দেয় খেয়েছি, কোনো দিন না, পরে খাব।
একদিন কথায় কথায় বলল দেশে ওর বাবা-মা আছে তাদের জন্য টাকা পাঠায়। ফোনে খোঁজখবর নেয়।
আমি সাধারণত ওকে বাইরের কাজে পাঠালে কিছু টাকা দিই যাতে এক গ্লাস ওভালটিন বা আইসক্রিম কিনে খেতে পারে। ও নেয়। কোনো কোনো দিন নিতে চায় না। তারপরও জোর করে দিই।
কয়েক দিন আগের ঘটনা। আমাদের অফিসের দুটি কম্পিউটার আছে কম্পিউটার শপে, সঙ্গে প্রিন্টার। আমাকে গিয়ে সব ঠিক আছে কি না চেক করে আনতে হবে। নীলাকে সঙ্গে নিলাম। যেতে যেতে কথা বলছি ওর সঙ্গে। বললাম তোমার বাবা-মায়ের জন্য খারাপ লাগে না। এই বিদেশে একা একা থাক?
হঠাৎ​ করে ও বলল, আমার তো আসল মা নেই, বাবা আছে। বাবা আবার বিয়ে করেছে। সেই ঘরে আমার তিন ভাইবোন আছে। আমি আমার দাদির কাছে বড় হয়েছি। আমি যে বাড়ি টাকা পাঠাই তা আমার দাদির জন্য। আমার দাদি আমার বাবার সঙ্গেই থাকে। আমি ফোন করি আমার দাদির কাছে।
জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার মা কোথায়? তোমার আসল মা নেই আর আমি এত দিনেও জানি না, তুমি তো আমাকে আগে বলনি!
আমার যখন ৯ মাস বয়স তখন আমার মা আমাকে রেখে থাইল্যান্ড আসে কাজের জন্য। এখানে আসার দুই বছর পর এক পাকিস্তানিকে বিয়ে করে। তারপর তার সঙ্গে পাকিস্তানে চলে যায়। সেখানে নাকি তার দুই ছেলে আছে। আমি বড় হয়ে এই সব গল্প শুনেছি। কারণ আমার নানি বাড়ি দাদি বাড়ি থেকে বেশি দূরে না। পাশাপাশি গ্রাম।
আমি বললাম তুমি বড় হয়ে কোনো দিন তোমার মাকে খোঁজ করনি। ও বলল, কয়েক দিন আগেই একজন ওকে ছবি দেখিয়েছে, ওর মা ফেসবুকে আছে, কিন্তু ও দেখতে চায় না। আমি বললাম, কেন, মাকে দেখতে ইচ্ছা করে না?
নীলা দেখলাম মুখ করুণ করে বলছে, দেখতে ইচ্ছা করে। কিন্তু যে মা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, কোনো দিন আমার খোঁজ নেয়নি, আমার দাদি আমাকে বড় করেছে, আমি যদি আমার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি আমার দাদি খুব কস্ট পাবেন। তাই আমি আমার মা ফেসবুকে আছে জেনেও আমি তার খবর নিই না। আমার নানিও ব্যাংককে আছে। অন্যদের কাছ থেকে আমার খবর নেয়। কিন্তু আমার কাছে আসার সাহস পায় না।
আমি বললাম তুমি কেন তোমার মাকে নিয়ে নেগেটিভ চিন্তা করছ? একটু ভাব আজ থেকে ১৭ বছর আগে যখন তোমার মা এই দেশে এসেছিল, তখন এত সহজ ছিল না কাজ পাওয়া বা সেটেল হওয়া। হয়তো তোমার মায়ের জীবনে যা কিছু ঘটেছে তার ওপরে তার কোনো হাত ছিল না। এই পরবাসে হয়তো তার কোনো উপায় ছিল না। তাই হয়তো ওই পাকিস্তানি লোকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল আর তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল। তাই বলে কি মনে হয় সে তোমাকে ভুলে গেছে? হয়তো তোমাকে ভোলেনি। মনে করে প্রতিদিন, কিন্তু কাউকে বলতে পারে না। হয়তো চুপি চুপি তোমার খবর নেয়, তুমি হয়তো জান না। মায়ের ওপর রাগ করে থেকো না। তোমার সঙ্গে তোমার মায়ের দেখা একদিন না একদিন হবে। আমি সেই দোয়া করি।
নীলা অভিমান ভরা কণ্ঠে বলল আমি চাই না আমার সঙ্গে আমার মায়ের দেখা হোক। আমাকে কেন ছেড়ে গিয়েছিল আর কোনো দিন কেন আমার খোঁজ নেয়নি।
মনে মনে ভাবতে লাগলাম মানুষের জীবন কত বিচিত্র। কত শত ঘটনা আছে এ রকম মানুষের জীবনে। আমি জানি কোনো একদিন হয়তো ওর মায়ের সঙ্গে ওর দেখা হবে, কথা হবে। একে অপরকে জড়িয়ে ধরবে। তারপর হয়তো এই রাগ আর থাকবে না। কিন্তু কবে সেই দিন? সেই দিন কি আসলেই আসবে নীলার জীবনে? আমি মনে মনে চাই নীলার জীবনে সেই দিন আসুক। ও ওর মায়ের বুকে মাথা রেখে পরান ভরে কাঁদুক, সব অভিমান ভুলে যাক।। এই পৃথিবীটা শুধুই হয়ে উঠুক মা আর মেয়ের।


কবিতাঃ মুনাজাত (কাজী নজরুল ইসলাম)

কবিতাঃ মুনাজাত
--- কাজী নজরুল ইসলাম

আমারে সকল ক্ষুদ্রতা হতে 
 বাঁচাও প্রভু উদার। 
 হে প্রভু! শেখাও -নীচতার চেয়ে 
 নীচ পাপ নাহি আর। 

 যদি শতেক জন্ম পাপে হই পাপী, 
 যুগ-যুগান্ত নরকেও যাপি, 
 জানি জানি প্রভু, তারও আছে ক্ষমা- 
 ক্ষমা নাহি নীচতার।। 

 ক্ষুদ্র করো না হে প্রভু আমার 
 হৃদয়ের পরিসর, 
 যেন সম ঠাঁই পায় 
 শত্রু-মিত্র-পর। 

 নিন্দা না করি ঈর্ষায় কারো 
 অন্যের সুখে সুখ পাই আরো, 
 কাঁদি তারি তরে অশেষ দুঃখী 

 ক্ষুদ্র আত্মা তার।। 


অপূর্ণ প্রেম (জয় শর্মা)

অপূর্ণ প্রেম
--- জয় শর্মা

দূর্বাঘাস যেমন শিশিরে ভেঁজা, ‘খাটি মেঘের জল’
তার চেয়ে তো খাঁটি আজো আমার প্রেমের বল্।
তবুও কেন ছিঁড়ে যেতে হবে শক্ত প্রেমের শিকল?
তুমি যাই চাও তাই দিয়ে যাবো! ‘আছে মনোবল’।
হয়ত আজো বেঁচে আছি আমি, এতো বিধাতার করুণা!
বাঁচবো না আর বেশিদিন জানি- ছাড়বো দুনিয়া।

ওপাড় যদি দ্বার খুলে দেয়- ‘ঈশ্বর দর্শন স্বরূপ’!
আমার অদৃশ্য প্রেম, ভাবনাতে তুমি আগলে রেখে দিও,
মিনতি রবে বিধাতার কাছে পুনর্জন্মে মিলনের! তখন-
এই জন্মে না পাওয়া সেই অপূর্ণ প্রেম- ‘পূর্ণ করে নিও’!

কেঁটে যাওয়া শত বিগত দিবসের প্রেমে ফাটল ধরে যদি
সেদিন বুঝে নিও- ‘আমার পূর্ণ প্রেমের খামতি রয়েছিল’
আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃত্তিকা মাঝে গড়ে তোলা-
প্রেমের শৃঙ্গী, ‘একটু অবহেলাই, চিরতরে ফাটল ধরেছিল’।
বিদায়বেলার সময়ে শুধু একটুখানি বলে যাবো তাই,
অপূর্ণ প্রেমে ফাটল ধরা সেই প্রেমেন্দ্র! আজ চিরমুক্তি চাই।


Thursday, October 20, 2016

জেনে রাখুন কাজে দেবে (Job xm special) চলুন শিখে রাখি (কিছু শব্দের পূর্ণরূপ)


★কিছু শব্দের পূর্ণরূপ★
-GPA,5 - এর পূর্নরুপ—Grade point Average ১। J.S.C - এর পূর্নরূপ — Junior School Certificate. ২। J.D.C - এর পূর্নরূপ — Junior Dakhil Certificate. ৩। S.S.C - এর পূর্নরূপ — Secondary School Certificate. ৪। H.S.C - এর পূর্নরূপ — Higher Secondary Certificate. ৫। A.M - এর পূর্নরূপ — Ante meridian. ৬। P.M - এর পূর্নরূপ — Post meridian. ৭। B. A - এর পূর্নরূপ — Bachelor of Arts. ৮। B.B.S - এর পূর্নরূপ — Bachelor of Business Studies. ৯। B.S.S - এর পূর্নরূপ — Bachelor of Social Science. ১০। B.B.A - এর পূর্নরূপ — Bachelor of Business Administration ১১। M.B.A - এর পূর্নরূপ — এর পূর্নরূপ — Masters of Business Administration. ১২। B.C.S - এর পূর্নরূপ — Bangladesh Civil Service. ১৩। M.A. - এর পূর্নরূপ — Master of Arts. ১৪। B.Sc. - এর পূর্নরূপ — Bachelor of Science. ১৫। M.Sc. - এর পূর্নরূপ — Master of Science. ১৬। B.Sc. Ag. - এর পূর্নরূপ — Bachelor of Science in Agriculture . ১৭। M.Sc.Ag.- এর পূর্নরূপ — Master of Science in Agriculture. ১৮। M.B.B.S. - এর পূর্নরূপ — Bachelor of Medicine and Bachelor of Surgery. ১৯। M.D. - এর পূর্নরূপ — Doctor of Medicine./ Managing director. ২০। M.S. - এর পূর্নরূপ — Master of Surgery. ২১। Ph.D./ D.Phil. - এর পূর্নরূপ — Doctor of Philosophy (Arts & Science) ২২। D.Litt./Lit. - এর পূর্নরূপ — Doctor of Literature/ Doctor of Letters. ২৩। D.Sc. - এর পূর্নরূপ — Doctor of Science. ২৪। B.C.O.M - এর পূর্নরূপ — Bachelor of Commerce. ২৫। M.C.O.M - এর পূর্নরূপ — Master of Commerce. ২৬। B.ed - এর পূর্নরূপ — Bachelor of education. ২৭। Dr. - এর পূর্নরূপ — Doctor. ২৮। Mr. - এর পূর্নরূপ — Mister. ২৯। Mrs. - এর পূর্নরূপ — Mistress. ৩০। Miss - এর পূর্নরূপ — used before unmarried girls. ৩১। M.P. - এর পূর্নরূপ — Member of Parliament. ৩২। M.L.A. - এর পূর্নরূপ — Member of Legislative Assembly. ৩৩। M.L.C - এর পূর্নরূপ — Member of Legislative Council. ৩৪। P.M. - এর পূর্নরূপ — Prime Minister. ৩৫। V.P - এর পূর্নরূপ — Vice President./ Vice Principal. ৩৬। V.C- এর পূর্নরূপ — Vice Chancellor. ৩৭। D.C- এর পূর্নরূপ — District Commissioner/ Deputy Commissioner. ৩৯। S.P- এর পূর্নরূপ — Police Super. ৪০। S.I - এর পূর্নরূপ — Sub Inspector Police.

আমাদের ফেসবুক- এখানে click করুন

আব্বাসী_খলীফা_হারুনুর_রশীদ ( ৭৮৬ - ৮০৯খ্রি. )


★ধর্মীয় তথ্য★

বাহলুল নামে এক পাগল ছিল । যে অধিকাংশ সময় কবরস্থানে কাটাতো । কবরস্থানে থাকা অবস্থায় একদিন বাদশাহ হারুনুর রশীদ তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন..... বাদশাহ তাকে ডাক দিলেন: বাহলুল ! ওই পাগল ! তোর কি আর জ্ঞান ফিরবে না ? বাহলুল বাদশাহর এ কথা শুনে নাচতে নাচতে গাছের উপরের ডালে চড়লেন এবং সেখান থেকে ডাক দিল: হারুন ! ওই পাগল ! তোর কি কোনদিন জ্ঞান ফিরবে না ? বাদশাহ গাছের নিচে এসে বাহলুলকে বললেন, আমি পাগল নাকি তুই, যে সারা দিন কবরস্থানে বসে থাকে ? বাহলুল বলল, আমিই বুদ্ধিমান । বাদশাহ: কীভাবে? বাহলুল রাজপ্রাসাদের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বললেন: আমি জানি এই রঙ্গীলা দালান ক্ষণিকের আবাসস্থল, এবং এটি (কবরস্থান) স্থায়ী নিবাস; এজন্য আমি মরার পূর্বেই এখানে বসবাস শুরু করেছি । অথচ তুই গ্রহণ করেছিস ঐ রঙ্গশালাকে আর এই স্থায়ীনিবাসকে (কবর) এড়িয়ে চলছিস । রাজপ্রসাদ থেকে এখানে আসাকে অপছন্দ করছিস ! যদিও তুই জানিস এটাই তোর শেষ গন্তব্য । এবার বল, আমাদের মধ্যে কে পাগল ? বাহলুলের মুখে এ কথা শোনার পর বাদশাহর অন্তর কেঁপে উঠল, তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁর দাড়ি ভিজে গেল । তিনি বললেন: আল্লাহ'র কসম ! তুমিই সত্যবাদী । আমাকে আরও কিছু উপদেশ দাও ! বাহলুল: তোমার উপদেশের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট । তাকে যথার্থভাবে আকড়ে ধর । বাদশাহ: তোমার কোন কিছুর অভাব থাকলে আমাকে বল, আমি তা পূরণ করব । বাহলুল: হ্যা, আমার তিনটি অভাব আছে, এগুলো যদি তুমি পূরণ করতে পার তবে সারা জীবন তোমার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করব । বাদশাহ: তুমি নিঃসঙ্কচে চাইতে পার । বাহলুল: মরণের সময় হলে আমার আয়ূ বৃদ্ধি করতে হবে । বাদশাহ: আমার পক্ষে সম্ভব নয় । বাহলুল: আমাকে মৃত্যুর ফেরেশতা থেকে রক্ষা করতে হবে । বাদশাহ: আমার পক্ষে সম্ভব নয় । বাহলুল: আমাকে জান্নাতে স্থান করে দিতে হবে এবং জাহান্নাম থেকে আমাকে দূরে রাখতে হবে । বাদশাহ: আমার পক্ষে সম্ভব নয় । বাহলুল: তবে জেন রাখ, তুমি বাদশাহ নও বরং তুমি অন্য কারও অধীনস্থ । অতএব তোমার কাছে আমার কোন চাওয়া বা প্রার্থনা নেই ।
আমাদের ফেসবুক- এখানে click করুন

Monday, October 17, 2016

যাদের লেখালেখি করার শখ কিন্তু ভাল করতে পারছেন না, এই পোষ্ট শুধু তাদের জন্য !


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দীর্ঘ অবসরময় বর্ষা কি করে কাটাবেন সে নিয়ে খুব ভাবনায় পড়ে গেলেন। ভেবে ভেবে বর্ষা কাটাবার জন্য কাজের ফিরিস্তি দিয়ে লিখলেন একটি দীর্ঘ কবিতা-’বর্ষাযাপন’। ’সোনার তরী’ কাব্যের এ কবিতায় দেখা যায়, কবি বর্ষার ঝুম বৃষ্টির মধ্যে কলিকাতা মহানগরীতে ঘরবন্দী হয়ে সময় কাটাবার জন্য নানা কাজ করছেন- জানালা পথে পাশের দালানগুলোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন, বিজলী চমক, বৃষ্টি-পতন দেখে আকাশ-পাতাল ভাবছেন, নি:সঙ্গতা কাটাবার জন্য খুলে বসছেন কালিদাসের ’মেঘদূত’, গোবিন্দদাসের পদাবলী খুলে পড়ছেন বর্ষা অভিষার- বিহব্বল হচ্ছেন একাকীনি রাধার বেদনায়, পড়ছেন গীতগোবিন্দ। এত কিছুর পরও সময় ফুরাতে না পেরে যা করতে বসলেন-

”তখন সে পুঁথি ফেলি, দুয়ারে আসন মেলি
বসি গিয়ে আপনার মনে,
কিছু করিবার নাই চেয়ে চেয়ে ভাবি তাই
দীর্ঘ দিন কাটিবে কেমনে।
মাথাটি করিয়া নিচু বসে বসে রচি কিছু
বহু যত্নে সারাদিন ধরে-
ইচ্ছা করে অবিরত আপনার মনোমত
গল্প লিখি একেকটি করে।
ছোটো প্রাণ,ছোটো ব্যথা ছোটো ছোটো দু:খকথা
নিতান্তই সহজ সরল,
সহস্ত্র বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি
তারি দু-চারিটি অশ্রুজল।
নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা,
নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ।
অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি’ মনে হবে,
শেষ হয়ে হইল না শেষ।
জগতের শত শত অসমাপ্ত কথা যত,
অকালের বিচ্ছিন্ন মুকুল,
অজ্ঞাত জীবনগুলা, অখ্যাত কীর্তির ধুলা,
কত ভাব, কত ভয় ভুল-
সংসারের দশদিশি ঝরিতেছে অহর্নিশি
ঝরঝর বরষার মতো-
ক্ষণ-অশ্রু ক্ষণ-হাসি পড়িতেছে রাশি রাশি
শব্দ তার শুনি অবিরত।
সেই-সব হেলাফেলা, নিমেষের লীলাখেলা
চারিদিকে করি স্তূপাকার,
তাই দিয়ে করি সৃষ্টি একটি বিস্মৃতিবৃষ্টি
জীবনের শ্রাবণনিশার।”

শুধু বাংলা ছোটগল্প নয়, বিশ্বের সেরা ছোটগল্প লেখকদের অন্যতম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাব্যচ্ছলে ছোটগল্পের ভিতর-বাহিরের সব রহস্য যেন আমাদের সামনে উন্মোচিত করে দিলেন। সকল সাহিত্য মাধ্যমের মধ্যে প্রাচীনতম ও কঠিনতম মাধ্যম কবিতা। এর পাশেই ছোটগল্পের স্থান।

ছোটগল্প কাকে বলে

কবিতা কি এটা যেমন বলা মুশকিল, ছোটগল্প কাকে বলে সেটাও বলা সমান বিপদের কাজ। ওপরে ছোটগল্প নিয়ে রবীন্দ্রনাথের যে উদ্ধৃতি পেশ করা হয়েছে সেটাকে কেউ কেউ সংজ্ঞা বলে চালাতে চান। আমি চাই না। কারণ সেখানে যা আছে তা ছোটগল্পের উপকরণ ও রচনাকৌশলসহ প্রায় সামগ্রিক রূপ।

অক্সফোর্ড এডভান্সড লার্নার্স ডিকশনারী বলছে- “a story, usually about imaginary characters and events, that is short enough to be read from beginning to end without stopping’’

এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা জানাচ্ছে- ’ brief fictional prose narrative that is shorter than a novel and that usually deals with only a few characters.’

ছোটগল্পের অন্যতম দিকপাল এডগার এলান পো বলেছেন, ’a short story should be read in one sitting, anywhere from a half hour to two hours.’

এইচ.জি.ওয়েলস ছোটগল্পকে ১০ মিনিট থেকে ৫০ মিনিটের মধ্যে পাঠযোগ্য বিবেচনা করেছেন।

এ সব সংজ্ঞা থেকে বোঝা যায়, ছোটগল্প শুধু আকারে ছোট হলেই হবে না, তার বিষয় আর বলার কৌশলও একটু আলাদা হবে। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় তার আভাস আছে। তাঁর মতে, জীবনের অনেক ঘটনা থেকে একটিকে নিয়ে বিশেষ ভাব আর কৌশলে গল্প লেখা হবে। সেখানে বর্ণনার বাহুল্য বা দর্শনের কচকচানি থাকবে না। গল্পটি জীবনের বিশেষ সময়ের একটা বিশেষ আবেগের রূপায়নের ভেতর দিয়ে সারা জীবনের আনন্দ বা বেদনার একটা আভাস দেবে। জানালার ছোট কপাট খুলে যেভাবে আমরা আকাশ দেখে নিই অনেকটা সে রকম করে। শেষ হয়ে শেষ না হবার যে অতৃপ্তি, সেটা জানালা খুলে আকাশ দেখে সে আকাশে উড়তে না পারার অবদমিত স্বপ্নকেই যেন তুলে ধরবে।

শ্রীশচন্দ্র দাশ তাঁর ’সাহিত্য সন্দর্শন’ নামক বইতে সামগ্রিক বিবেচনায় ছোটগল্প সম্পর্কে বলেছেন, ’ছোটগল্প মানব জীবনের গভীরতর রহস্য ভেদ করিতে চায় না, জীবনের অবিরাম স্রোতে ক্ষণপ্রাণ ও ক্ষণবিলীয়মান যে তরঙ্গ উঠিতেছে,পড়িতেছে, ভাঙ্গিতেছে, তাহাকেই লেখক স্থির দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করেন। ইহাতে নাটক-উপন্যাসের বা মহাকাব্যের বিস্তৃতি নাই– জীবনের খন্ডরূপ এইখানে একটি বিশেষ রূপে ধরা দেয়। এই রূপ সৃষ্টিকে সার্থক করিবার জন্য লেখক গল্পের উপাদান ও ভাববিন্যাস একটি মাত্র রসপরিণামমুখী করিয়া তুলিতে চেষ্টা করেন। শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পের ইহাই আদর্শ।’

গল্প-ছোটগল্প

’ছোটগল্প’ খুব বেশি বয়সী সাহিত্য মাধ্যম নয়, কিন্তু গল্পের বয়স অনেক। মুখে মুখে গল্প বলার ইতিহাস কবে শুরু হলো তা বলাই মুশকিল।মা কিংবা দাদা-দাদীর মুখে গল্প শুনে ঘুমিয়ে পড়ার গল্পটাও কিংবদন্তী হয়ে গেছে। ঈশপের গল্প বা জাতকের গল্প খ্রীস্টের জন্মেরও অনেক আগে লেখা। তবে সবার আগে গল্পে হাত পাকিয়েছেন মিশরীয়রা। ধর্মীয় বিষয় কাব্যে থাকলেও প্যাপিরাসে লেখা বাকী সব কিছুই ছিলো গদ্যে। অর্থাৎ তারাই প্রাচীনতম গদ্যের অধিকারী। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত প্রাচীনতম মিশরীয় গল্পসঙ্কলনের নাম ‘The Shipwrecked Sailor’ (জাহাজডোবা নাবিক), যা খ্রীস্টপূর্ব ২০০০ সালে রচিত বলে ধারনা করা হয়।

আব্বাসীয় যুগের আরব্য রজনীর গল্প ধারাবাহিক গল্পবলার ধ্রুপদী নিদর্শন। পারস্যের অনুদিত গল্প তোতা কাহিনী কিংবা ঠাকুর মা’র ঝুলি আমাদের গল্পের ইতিহাসের স্বর্ণ-সম্ভার। মুখে মুখে প্রচলিত গল্পগুলোই হোমারের ’ইলিয়াড’ আর ’ওডিসী’র মতো মহাকাব্যে রূপ পেয়েছে। শেক্সপীয়রের নাটকের উপকরণও জুটেছে মুখে মুখে প্রচলিত গল্প থেকে।

ছোটগল্পের জন্ম এ সব গল্পের ধারনা থেকে, সেটা বলাই বাহুল্য। আজকের ছোটগল্পের পূর্বপুরুষ বিবেচনা করা হয় চতুর্দশ শতকের ইংরেজ লেখক জিওফ্রে চসারের ’কেন্টারবারী টেলস’ আর রোমান লেখক বোকাচ্চিওর ’ডেকামেরন’কে। দুটোই পৃথকভাবে লেখা ছোট ছোট গল্পের সমাহার। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি ফরাসী সাহিত্যে ছোট আকারের উপন্যাস ’নভেলা’ আবির্ভূত হয়। এরপরই ইউরোপীয় গল্প জগতে বিপ্লব নিয়ে আসে ইউরোপীয় ভাষায় ’আরব্যরজনী’র অনুবাদ। বেশিরভাগ গুনীর মতে এখান থেকেই ছোটগল্পের বর্তমান ধারনার সূত্রপাত। অষ্টাদশ শতকে ভলতেয়ারসহ অন্যান্য ইউরোপীয় লেখকের লেখায় আরব্যরজনীর সুস্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়।

যুক্তরাজ্যের প্রথম উলেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ রিচার্ড কাম্বারল্যান্ডের ’ দা পয়জনার অব মনট্রিমাস’(১৭৯১)।

এরপর বিখ্যাত উপন্যাস লেখক স্যার ওয়াল্টার স্কট এবং চার্লস ডিকেন্স কিছু ছোটগল্প লেখেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত প্রথম উলেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ চার্লস ব্রোকডেন ব্রাউনের ’সমনামবুলিজম’ (১৮০৫)।
এরপর আসে ওয়াশিংটন আর্ভিংয়ের বিশ্ববিখ্যাত গল্পগ্রন্থ ’রিপ ভ্যান উইংকেল’ (১৮১৯) এবং ’দা লিজেন্ড অব স্লিপিং হোলো’ (১৮২০)। নাথানিয়েল হথোর্নের গল্পগ্রন্থ ’টোয়াইস টোল্ড টেলস’-এর প্রথম খন্ড প্রকাশ পায় ১৮৩৭ সালে। এরপরেই দৃশ্যপটে আসেন ছোটগল্পের প্রধান গুরুদের একজন এডগার এলান পো। যাঁকে রহস্য-উপন্যাসের পিতার সম্মান দেয়া হয়। তাঁর ছোটগল্পেও রহস্যের ছোঁয়া আছে। ১৮৩২ থেকে ১৮৪৯ সালের মধ্যে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গল্পের মধ্যে রয়েছে ’দা ফল অব দা হাউস অব আশার’, দা টেল টেইল হার্ট’, ’দা পিট এন্ড দা পেন্ডুলাম’।
তাঁর বিখ্যাত গোয়েন্দা গল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ’দা মাডার্স ইন দা রু মর্গ্’।

এ সময়ে জার্মানী এবং ফ্রান্সেও ছোটগল্পের বই প্রকাশিত হয়। তখন রাশিয়ায় ছোটগল্প লেখেন আলেক্সান্ডার পুশকিন এবং নিকোলাই গোগোলের মতো ধ্রুপদী লেখকরা।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে ছোটগল্পে সোনার ফসল ফলিয়েছেন টমাস হার্ডি, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লেখক রুডিয়ার্ড কিপলিং, রহস্যগল্পের দিকপাল আর্থার কোনান ডয়েল (দা এডভেঞ্চারস অব শার্লক হোমস খ্যাত), বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর দিকপাল এইচ.জি.ওয়েলস, মবিডিক খ্যাত হেরমেন মেলভিল, মার্ক টোয়েন, হেনরী জেমস প্রমুখ।

এঁদের পর আসেন ছোটগল্পের যাদুকরদের একজন, অঁরি রেনি আলবেয়র গী দ্য মোপাশা। তাঁর লেখা ’নেকলেস’ (ডায়মন্ড নেকলেস), বোল দা সৌপ (চর্বির বল), ইন দা স্প্রিং , এন ওল্ড ম্যান, রাস্ট, টু ফ্রেন্ডস, কনজারভেটরী, দা ম্যাটার উইথ আন্দ্রে ইত্যাদি গল্প অবিস্মরণীয়। একই সময় রাশিয়ায় গল্পের পশরা সাজান ইভান তুর্গেনেভ, ফিওদর দস্তয়েভস্কি, লিও টলস্টয়, ম্যাক্সিম গোর্কি এবং ছোটগল্পের আরেক শীর্ষ দিকপাল আন্তন চেখভ।

গত শতকের প্রথমার্ধে গল্প লিখেছেন হেক্টর হিউ মুনরো (সাকী), উইলিয়াম সমারসেট মম, ভার্জিনিয়া উলফ, গ্রাহাম গ্রীন, আর্থার সি. কার্ক, জেমস জয়েস, নোবেল বিজয়ী লেখক উইলিয়াম ফকনার, আরেক নোবেল বিজয়ী আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর দিকপাল আইজাক আসিমভ, নোবেলজয়ী জার্মান লেখক টমাস মান, ফ্রান্স কাফকা প্রমুখ।

গত শতকের শেষার্ধে ছোটগল্পচর্চা করেছেন নোবেলজয়ী লেখক জন স্টেইনবেক, ফিলিপ রথ, জেমস বল্ডউইন, স্টিফেন কিং, ইতালো ক্যালভিনো, নোবেল বিজয়ী পর্তুগীজ লেখক হোসে সারামাগো, জর্জ লুই বোর্গেস, জুলিও কোর্তাসার, নোবেল বিজয়ী লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, পেরুর নোবেল জয়ী লেখক মারিও ভার্গাস ইয়োসা, নোবেল জয়ী মিসরীয় লেখক নাগিব মাহফুজ, তিন জাপানী লেখক-নোবেল জয়ী কেনজাবুরো ওয়ে, ইয়োকি মিশিমা এবং সম্ভাব্য নোবেল জয়ী বলে কয়েক বছর ধরে আলোচিত হারুকি মুরাকামি। সমকালীন ছোটগল্পের ’মাস্টার’ হিসাবে পরিচিত কানাডীয় লেখিকা এলিস মুনরো এ বছর (২০১৩) ছোটগল্পের জন্য নোবেল পুরস্কার জিতেছেন।

বাংলা ছোটগল্পের ভূবন

বাংলায় অনুদিত ’পঞ্চতন্ত্র’, ’জাতকের গল্প’, ’তোতা কাহিনী’ ও ’আরব্যরজনীর গল্পে’র উত্তরাধিকার আর ’ঠাকুর মার ঝুলি’র সোনালী অতীত নিয়ে বাংলা ছোটগল্পের ঘরগেরস্থালী অনেক সমৃদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পকার হিসাবে বিশ্বের সেরাদের এক জন। বাংলা ছোটগল্পের কারিগরদের মধ্যে প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শওকত ওসমান, জসীম উদদীন, সৈয়দ মুজতবা আলী, আবু রুশদ, সৈয়দ ওয়ালীউলাহ, বনফুল, আউদ্দিন আল আজাদ, জহীর রায়হান, আবু ইসহাক, আবদুল মান্নান সৈয়দ, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আল মাহমুদ, বেগম রোকেয়া, বুদ্ধদেব বসু, কাজী নজরুল ইসলাম, আবুল মনসুর আহমদ, শাহেদ আলী উলেখযোগ্য।

সমকালীন গল্পকারদের মধ্যে রয়েছেন সাদ কামালী, আহমেদ মোস্তফা কামাল, হুমায়ুন মালিক, মঞ্জু সরকার, অদিতি ফাল্গুনী, হরিশঙ্কর জলদাস প্রমুখ।

বিশ্বের সেরা গল্পের মতো বাংলা ছোটগল্পেও আছে বিষয় আর প্রকরণের ব্যাপক বৈচিত্র্য। রবীন্দ্রনাথের গল্পে আছে মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত মানুষের সুখদুখের ছবি। আছে প্রেমের গল্প বা ভৌতিক গল্পও। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া রবীন্দ্রনাথের গল্পগুলো আকারে দীর্ঘ। ’নষ্টনীড়’ তো এখনকার উপন্যাসের আকারের। মানিক, ইলিয়াস কিংবা হাসান আজিজুল হকের গল্পগুলোও দীর্ঘ। ব্যতিক্রম বনফুল। তাঁর বেশিরভাগ গল্প ছোট আকারের। ’নিমগাছ’ বা ’বিধাতা’র মতো বিখ্যাত গল্প এক পৃষ্ঠাতেই সীমাবদ্ধ। সমাজ চেতনা, রাজনীতি সচেতনতা, নিরীক্ষাধর্মিতা সাম্প্রতিক ছোটগল্পে লক্ষ করা যায়।

আরো গল্প ? কেন ?

এতো সব দুর্দান্ত লেখকের মন পাগল করা গল্পের পর আরো গল্প কি প্রয়োজন আছে ? এটা হতে পারে লাখ টাকার প্রশ্ন।

আমার মতে আরো অনেক গল্প লেখার বাকী রয়ে গেছে। নতুন নতুন মানুষ এসেছেন পৃথিবীতে। তাঁদের জীবনে তথ্যপ্রবাহ আর প্রযুক্তি বহু নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। বিশ্বের সব কিছু এখন মানুষের অভিজ্ঞতার অংশ। একেক জনের অভিজ্ঞতা একেক রকম। একই অভিজ্ঞতার দ্যোতনা নানাজনের কাছে নানাভাবে প্রতিভাত হয়। কার চেয়ে কার গুরুত্ব কম ?
এ সব তুলে ধরার জন্য ছোটগল্প একটি ভালো মাধ্যম। যদিও উপন্যাস আর পেশাগত জীবনের জন্য দরকারী বইয়ের জনপ্রিয়তার মুখে কবিতা, ছোটগল্প জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। বাংলাদেশে কবিতা আর গল্পের বইয়ের প্রকাশক আর ক্রেতা পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। কিন্তু গল্প শোনার চিরন্তন আগ্রহই ছোটগল্পের জন্য সুখবর। আপনার গল্পে যদি আকর্ষণীয় গল্প থাকে তাহলে সেটা মানুষ পড়বেই। তাই লিখতে পারেন আপনার গল্পও।

কিভাবে লিখা যায় গল্প ?

কিভাবে গল্প লেখা যায় এ প্রশ্নের জবাব দেয়া অসম্ভব কাজ। কারণ প্রকৃত সৃজনশীলতার কোন ম্যানুয়াল হয় না। কারণ প্রকৃত শিল্পীর প্রতিটি কাজই মৌলিক। কারো সাথে সেটা মিলবে না। যেটা করা সম্ভব সেটা হচ্ছে আরেকজনের অভিজ্ঞতার কথা জানা। কারণ অভিজ্ঞতা খুবই মূল্যবান। প্রায়ই সেটা কেমন করে যেন কাজে লেগে যায়।

জ্ঞান আর সৃজনশীলতার জগতে গুরুর কাছে শিক্ষা নেবার কিছু নজীর আমরা পাই। ফ্লবেয়রের কাছে মোপাশার লিখতে শিখার কথা আমরা সবাই জানি। সে শিক্ষা আর আপন প্রতিভাবলে মোপাশা হয়ে উঠেছেন ফরাসী সাহিত্যের সবচেয়ে নিপুন গদ্য লেখক। গান বাজনার কথা না হয় তুললাম না। আরেকটা খবরও আমাদের জানা আছে, সেটা হচ্ছে অভিজ্ঞতা বিনিময়। ফলে বিভিন্ন জনের মতের মিলের ভেতর দিয়ে শিল্পে সাহিত্যে নানা আন্দোলন দানা বেঁধেছিলো। যেমন- ইম্প্রেশনিজম, এক্সপ্রেশনিজম, সুররিয়ালিজম, কাঠামোবাদ, উত্তর কাঠামোবাদ, বিনির্মানবাদ ইত্যাদি।

তাই গল্প লেখার অভিজ্ঞতা শেয়ার করা যেতেই পারে।

কি কি চাই গল্পের জন্য ?

কি কি চাই গল্পের জন্য তার তালিকাটা এমন-

১. আইডিয়া: গল্পের উপকরণ ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। চোখ কান খোলা রেখে সেখান থেকেই বেছে নিতে হবে আইডিয়া। যা নিয়ে গল্প লেখা যায়। আইডিয়া মনের মধ্যে হঠাৎ উঁকি মারে। তাই ছোট একটা নোট বই আর কলম সাথে থাকা ভালো। চট করে টুকে নেয়া যায় যেন। চোখের সামনে ঘটা কোন ঘটনা বা দৃশ্য হতে পারে গল্পের প্রেরণা। কপাল ভালো থাকলে পুরো গল্পই মুহূর্তের মধ্যে খেলে যেতে পারে আপনার মনে। কখনো কখনো আকাল পড়তে পারে আইডিয়ার। তখন বন্ধু বা ঘরের কেউ এগিয়ে আসতে পারেন। অভিজ্ঞতাও আইডিয়ার বড়ো সরবরাহকারী। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর ’গ্র্যান্ডমাস্টার’ আইজাক আসিমভ অভিজ্ঞতা থেকেই পেয়েছেন বহু গল্পের আইডিয়া। সব মহৎ গল্পও এসেছে মহান লেখকদের অভিজ্ঞতার ভেতর থেকেই। অভিজ্ঞতার বাইরে যাওয়া কিংবা স্বল্প অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখতে যাওয়া অনেক সময় ভালো লেখার জন্য বিপদ ডেকে আনে।

২. গল্পের মূল কাঠামো: জানতে হবে গল্পের মূল কাঠামোটার গড়ন কেমন। কারণ আইডিয়াকে গল্পে রূপ দিতে হবে যুৎসই একটা কাঠামোতে। একে সাধারণত: প্লট বলা হয়। যাতে থাকে একটা সূচনা। সূচনায় থাকবে স্থান-কাল-পাত্র সম্পর্কে ধারণা। এরপর আসবে ঘটনাক্রম। যার ভেতর দিয়ে ঘটনার ঘনঘটা গতি পেতে শুরু করবে অর্থাৎ গল্প কাইমেক্সের পথে আরোহন করতে শুরু করবে। তারপর কাইমেক্স, জমজমাট ঘটনাবলীর মূল বিবরণ। চলতে আরম্ভ করবে পরিণতির পথে। সবশেষে সুন্দর আনন্দদায়ক পরিণতি কিংবা বিষাদাত্মক সমাপনী। লেখার প্রয়োজনে, বৈচিত্র্য আনার জন্য গল্পে ব্যবহার করুন সংলাপ। সংলাপের ব্যবহারের দক্ষতা আর বৈচিত্র্য লেখকের মুন্সীয়ানার পরিচয় বহন করে।

৩. কাছের মানুষের কাছেই সমাধান: কাকে নিয়ে লিখবেন তা যদি সহজে মিলে যায় তাহলে সমস্যাই থাকে না। যদি খুঁজে না পান গল্পের নায়ক বা নায়িকা তাহলে বেছে নিন আপনার কাছের কোন মানুষকে যিনি কোন না কোনভাবে আপনার এবং অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। তাঁর কান্ডকীর্তিই হতে পারেন আপনার গল্পের বিষয়।

৪. জানুন আপনার গল্পের চরিত্রদের: গল্পটা বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে গল্পের চরিত্রগুলোও হতে হবে বাস্তবসম্মত। পাঠক যাতে সহজেই চিনতে পারেন তাদের। বাস্তব মানুষদের আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা খুব কঠিন। মানুষ বিশ্বাসযোগ্যতা আর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব দুটোই চায়। এ বিপদ সামলাতে হলে লেখককে জানতে হবে তার সম্ভাব্য চরিত্রের সবদিক- নাম, ঠিকানা, পদবী, চেহারা, গায়ের রঙ, স্বভাব (রাগী/শান্ত/ভদ্র/অভদ্র/অস্থির/ধীরস্থির), তার প্রিয় রঙ/পোষাক/ খাবার; কথা বলার ভঙ্গি/আঞ্চলিক কোন টান; কোন মুদ্রাদোষ আছে কি না; আবেগ প্রবণ কিনা; চরিত্রের যে সব দুর্বলতা (পানাসক্তি/ধুমপায়ী); চরিত্রের ত্রুটি (মানুষ কোন নিখুঁত চরিত্র চায় না, আবার এমন বেশি দুর্বলতা চায় না যা অতিরিক্ত মনে হয়)।
এর সব কিছু এক গল্পে দরকার হবে না। বর্ণনার বিস্তৃতি উপন্যাসের বিষয়। গল্পকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য যেটুকু লাগবে সেটুকুই ব্যবহার করতে হবে।

৫. গল্পের পরিসর সীমিত রাখতে হবে: গল্পের প্লট থাকবে একটি, চরিত্র কয়েকটি,ঘটনার বিস্তৃতি কয়েক দিনের মধ্যে (প্রয়োজনে কয়েক ঘন্টা) সীমিত থাকবে। রবীন্দ্রনাথ, টলস্টয়, মোপাশা বা এলান পো’র বেশিরভাগ গল্প কিছুটা দীর্ঘ; অন্যদিকে চেখভ, বনফুলের গল্প বেশ ছোট আকারের। গল্পের ভেতর একাধিক প্লট বা বেশি চরিত্র ঢুকে পড়লে সেটাকে গল্পের বদলে নভেলা বা উপন্যাসে পরিণত করাই শ্রেয়।

৬. গল্পের কথক: গল্প লেখা হয় তিন ধরণের ভাষ্যে- উত্তম পুরুষ (গল্পের কোন চরিত্র নিজে গল্পের কথক), মধ্যম পুরুষ (কথক দর্শকের ভূমিকায় অর্থাৎ পাঠক নেমে যান কথকের ভূমিকায়) আর নাম পুরুষ ( লেখক নৈর্ব্যক্তিক দূরত্বে থেকে গল্প বলেন, মনে হবে একজন অজ্ঞাতনামা দর্শক গল্পটির বর্ণনা দিচ্ছেন)।

মধ্যম পুরুষে লেখা গল্পের সংখ্যা কম। উত্তম পুরুষে লেখা গল্পে গল্পের চরিত্রের পক্ষে যতোটা জানা সম্ভব ততোটাই লিখা উচিৎ। এতে বর্ণনায় সীমাবদ্ধতা এসে যায়। নাম পুরুষে গল্প বলায় বর্ণনার পরিসর একটু বাড়ে, লেখক কিছুটা বাড়তি স্বাধীনতা পান। কারণ অজ্ঞাত কথকের পক্ষে বেশি খবর জানা খুব স্বাভাবিক মনে হবে পাঠকের কাছে। লেখক চাইলে আরেকটা কৌশল অবলম্বন করতে পারেন। গল্পের বয়ানে উত্তম পুরুষ আর নাম পুরুষের বর্ণনা মিলিয়ে নিতে পারেন। উত্তম পুরুষে লেখা আরম্ভ করে নাম পুরুষে পরের অংশ বিশেষ বর্ণনা করা। এভাবে বয়ানভঙ্গিও কথক পরিবর্তনের মিশ্রন ব্যবহার করা যেতে পারে। জাপানী লেখক আকুতাগাওয়া রায়ুনোসুকে তাঁর বিখ্যাত গল্প ’রশোমন’-এ কৌশলটি স্বার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন (এ গল্প অবলম্বনে আকিরা কুরোশাওয়া বিশ্বখ্যাত ’রশোমন’ চলচ্চিত্রটি নির্মান করেছিলেন)।

৭. মন গোছানো: লেখার আগে গল্পের বিষয়গুলো মনের মধ্যে গুছিয়ে নিতে হবে। আরম্ভ করবেন কিভাবে এবং পর্যায়ক্রমে গল্পটি শেষ করবেন কিভাবে তার ধাপগুলো মনের ভেতর গুছিয়ে নিন। এটাকেই আমি বলছি মন গোছানো। প্রয়োজনে পয়েন্ট আকারে নোট রাখতে পারেন।

৮. লেখা শুরু করুন: সব চেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটা হচ্ছে লিখতে শরু করা। প্রথম পৃষ্ঠা, বিশেষ করে প্রথম বাক্যটি লেখা সব চেয়ে কঠিন বলে মনে করেন লেখকরা। অনেক সময় প্রথম বাক্যটির জন্যই পাঠক গল্পের বাকী অংশটি পড়েন। সূচনাটা হতে হবে সংক্ষিপ্ত। কারণ গল্পের পরিসর কম। অনেক সময় শুরুটা হতে পারে নাটকীয়। রবীন্দ্রনাথের ’হৈমন্তী’ গল্পের প্রথম বাক্যটি স্মরণ করা যেতে পারে- ’কন্যার বাপ সবুর করিতে পারিতেন, কিন্তু বরের বাপ সবুর করিতে চাহিলেন না।’ হৈমন্তী গল্পের যে কালপর্ব তখনকার হিসাবে কন্যার বয়স অনেক বেশি ছিলো। সে বিবেচনায় কন্যার বাপেরই তাড়া থাকার কথা। পুরো বিষয়টা উল্টো, অস্বাভাবিক। তাই নাটকীয়। পরের বাক্যগুলোতে রবীন্দ্রনাথ কার কেন তাড়া তার ব্যাখ্যা হাজির করে রহস্যমোচন করেছেন। ও হেনরী ওরফে উইলিয়াম সিডনী পোর্টার-এর বিখ্যাত গল্প ”গিফট অব দা ম্যাজাই”-এর প্রথম বাক্য-’এক ডলার সাতাশি সেন্ট।’ অতি সাধারণ এবং অসম্পূর্ণ প্রকৃতির এ বাক্যটিই পাঠককে গল্পের ভেতরে টেনে নিয়ে যায়। পাঠক যে গল্পে আবিষ্কার করেন ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর অসাধারণ এক প্রেমকাহিনী। দরিদ্র নবীন দম্পতি জিম ও ডেলার পরিবারের ছিলো দুটি মাত্র সম্পদ, যা তাদের অতিপ্রিয় আর গর্বের বস্তু। দাদার আমলে কেনা জিমের সোনার ঘড়ি আর ডেলার আকর্ষণীয় দীর্ঘ চুল। বড়োদিন উপলক্ষে দুজনেই পরষ্পরকে চমকপ্রদ উপহার দেবে বলে মনে মনে ঠিক করে। নানা ঘটনার ভেতর দিয়ে দেখা গেলো জিম তার শখ ও গর্বের সোনার ঘড়িটি বেচে ডেলার জন্য দামী চিরুনী সেট কিনেছে আর ডেলা নিজের অতিকষ্টে জমানো সেই এক ডলার সাতাশি সেন্টের সাথে নিজের দীর্ঘ চুল সাত ডলারে বেচে জিমের সোনার ঘড়ির জন্য আট ডলার দামের প্লাটিনামের চেন কিনে এনেছে। দুটি উপহারই অর্থহীন হয়ে পড়েছে কিন্তু তাদের ভালোবাসাকে তুলে দিয়েছে স্বর্গীয় উচ্চতায়।

৯. দ্রুত শেষ করে ফেলুন: সব চেয়ে ভালো হয় এক বসায় গল্পটি লিখে শেষ করে ফেললে। কারণ দ্রুত শেষ করতে পারলে অখন্ড মনোযোগের মাধ্যমে ভালো একটি সৃজনকর্ম সম্পন্ন করা সহজতর হয়। সেটা সম্ভব না হলে প্রতিদিন অন্তত একপাতা করে লিখতে পারলে ভালো হয়। তাহলে গল্পের পুরো গাঁথুনীতে চিন্তার ঐক্য বজায় রাখা সম্ভব হয়। তবে সময় নিয়ে লিখলেও সমস্যা হয় না কারো কারো। বর্তমান সময়ের শ্রেষ্ঠ গল্পকারদের একজন এ বছরের নোবেল জয়ী ছোটগল্পকার এলিস মুনরো প্রচুর সময় নিয়ে লেখেন। তবে তিনি প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে লিখতে বসেন। আরেকটা ছোট বিষয় মনে রাখলে ভালো হয়, গল্প যে সব সময় আপনার পরিকল্পনা মতো এগুবেই তার কোন ঠিক নেই। অনেক সময় দেখবেন লিখতে লিখতে গল্পের গতিপথ আপনার ভাবনার বেড়ি ছিঁড়ে নিজের মতো পথ করে নিচ্ছে। তাতে ঘাবড়াবার কিছু নেই। দেখবেন গল্প আপনাকে আপনার ভাবনার বাইরের এক গল্পের দিকে নিয়ে গেছে। তাতে গল্পটা আরো আকর্ষণীয় হয়েও যেতে পারে।

১০. সমাপ্তি: গল্পের বিষয়ে আরম্ভের মতো শেষটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছোট পরিসরে শেষ করতে হয় বলে শেষটাও রাখতে হয় সংক্ষিপ্ত, কিন্তু ইঙ্গিতময়। কারণ শেষ হয়েও শেষ না হবার একটা তৃপ্তিময় অতৃপ্তির আভাস থাকতে হয়। কখনো নাটকীয়তায় শেষ হতে পারে। কখনো কখনো আকস্মিকতায় শেষ হতে পারে। যে আকস্মিকতার ধাক্কায় মন হতবিহব্বল হয়ে যায়। মোপাশার বিশ্ব বিখ্যাত গল্প ’নেকলেস’ একটা আকস্মিক অপ্রত্যাশিত তথ্য দিয়ে এমনভাবে শেষ করা হয়েছে তাতে পাঠক বিস্ময়ে বেদনায় হতবাক হয়ে যান। গল্পের নায়িকার জন্য সমবেদনায় নিজের অজান্তেই চোখ মুছতে আরম্ভ করেন। সুন্দরী মাতিলদে ভাগ্যদোষে গরীব কেরানীর বউ। এক সরকারী পার্টিতে যাবার সময় ধনী বান্ধবীর হীরার নেকলেস ধার নিয়েছিলেন। পার্টি থেকে ফেরার পথে নেকলেসটি হারিয়ে ফেলেছিলেন মাতিলদে। বাধ্য হয়ে নিজেদের সব সঞ্চয় আর পরিচিত অনেক জন থেকে ধার করে, চড়া সুদে টাকা নিয়ে ছত্রিশ হাজার ফ্রাঁ খরচ করে অনুরূপ হীরার নেকলেস কিনে বান্ধবীকে ফেরৎ দেন। তবে ঘটনাটা বান্ধবীর কাছে সঙ্গত কারণেই গোপন রাখেন। স্বামী-স্ত্রী অমানবিক পরিশ্রম করে দশ বছরে ধার শোধ করেন। ফলে অকালে বুড়িয়ে গিয়ে সুন্দরী মাতিলদে কুশ্রী রমনীতে পরিণত হন। পথে বান্ধবীর সাথে হঠাৎ দেখা হলে প্রথমে তিনি মাতিলদেকে চিনতেই পারেননি। পরিচয় দেবার পর চিনতে পারেন। মাতিলদের চেহারার করুন অবস্থা দেখে বান্ধবী ব্যথিত হন। কথায় কথায় নেকলেস কিনে দেবার কথা বলে ফেলেন মাতিলদে। তখন তাঁকে হতবাক করে বান্ধবী জানান তাঁর নেকলেসটি ছিলো নকল হীরার (ইমিটেশন), দাম মাত্র পাঁচ শ’ ফ্রাঁ ! নিজেদের অজ্ঞাতে এই নকল নেকলেসের বদলা দিতেই তাঁদের জীবনের সব স্বপ্ন সাধ ধূলিস্মাৎ হয়ে গেছে! কিংবা বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায় ওরফে বনফুলের ’নিমগাছ’ গল্পটির সমাপ্তির কথাই ধরুন। সারা গল্পে আছে বাড়ীর ময়লা ফেলার জায়গায় বড়ো হয়ে ওঠা এক নিমগাছের বেদনার কাহিনী। শুধু শেষ বাক্যটিতে বনফুল লিখেছেন,”ওদের বাড়ীর গৃহকর্ম-নিপুনা লক্ষ্মী বউটার ঠিক এই দশা।” এক বাক্যেই পুরো গল্পের মানে বদলে গেলো!

১১. সম্পাদনা ও পুন:লিখন : গল্প লেখা শেষ হবার পর আপনাকে বসতে হবে সম্পাদনার খুব ধারালো কাঁচি নিয়ে। প্রথমে শুরু করতে হবে বানান, বিভক্তির ব্যবহার, ক্রিয়াপদের ব্যবহার এসব ঠিকঠাক করার জন্য। বানান সমতার একটা বিষয়ও আছে। রবীন্দ্রনাথের পাণ্ডুলিপির ভেতরের সম্পাদনার বহু চি‎‎হ্ন মিলে ছবির আকৃতি ধারন করেছে। পাশ্চাত্যের পেশাদার লেখকরা একই লেখা কমপক্ষে তিন বার লেখেন। প্রথম খসড়াকে তাঁরা অখাদ্য বিবেচনা করেন। এটা কাউকে দেখতে পর্যন্ত দেন না। প্রথম খসড়া বড়ো জোর গল্পটা সম্পর্কে ধারনা সৃষ্টির কাজেই ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয় খসড়াও তাঁরা ত্রুটি সংশোধনের জন্য সম্পাদনা করেন না। এটা ব্যবহার করা হয় কাঠামো বদল (যদি দরকার মনে করেন লেখক) প্লট বা গল্পের সব চরিত্রের ঘষামাজা বা মূল বক্তব্যের সঠিক উপস্থাপন কৌশল ঠিক করার জন্য। তৃতীয় খসড়ায় গিয়ে চূড়ান্ত ঘষা মাজা করে সম্পাদকের টেবিলে পাঠান (কেউ কেউ পাঁচ/সাতবারও লেখেন একই লেখা)।
পাশ্চাত্যের বড়ো প্রকাশকরা পেশাদার সম্পাদকদের মাধ্যমে সম্পাদনা ছাড়া কোন লেখা প্রকাশ করেন না। এটা সুপারহিট লেখক বা নোবেল পুরস্কার জয়ী লেখকদের জন্যও প্রযোজ্য। নোবেল জয়ীদের ক্ষেত্রে ঘষামাজার মাত্রা বাড়ে বই কমে না।

সৈয়দ শামসুল হক দুই থেকে পাঁচ বছর ধরে ভাবনা চিন্তা করে গল্প বা উপন্যাস লেখেন। অন্তত: দুটি খসড়া করেন গল্প বা উপন্যাসের। তাঁর যে পাঁচটি কাব্যনাটক আমরা পেয়েছি (পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নূরুলদীনের সারা জীবন ইত্যাদি) তার প্রতিটিই তৃতীয়বারের লেখা। একই কবিতা লেখেন দশ থেকে পনেরো বার। তার জন্য সময় নেন বছরের পর বছর। তাঁর যে কবিতা আপনি আজ পড়বেন কোন কাগজে সেটাই হয়তো খোঁজ নিলে জানা যাবে সৈয়দ হক প্রথমবার লিখেছিলেন আট বা দশ বছর আগে এবং প্রকাশিত পাঠটি হয়তো পনেরতমো বারে লেখা। পৃথিবীর সকল মহান লেখকের জীবনের ঘটনাগুলোই কমবেশি এরকম। ছোটগল্পের জন্য এ বছরের (২০১৩) নোবেল সাহিত্য পুরস্কার জয়ী কানাডীয় লেখিকা এলিস মুনরো এক সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি অনেক সময় নিয়ে খুব ধীরে লেখেন। প্রচুর কাটাকাটি (সম্পাদনা) করেন। সম্পাদনা লেখালেখির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই প্রথম পাঠ লেখার পরে সম্পাদনা ও পুন:লিখনের পর লেখাটি কয়েকদিন বা সপ্তাহ বা মাসের জন্য তুলে রাখবেন। এরপর যখন পড়তে বসবেন তখন লেখার সাথে আপনার একটা আবেগগত দূরত্ব তৈরী হবে। এ দূরত্বই আপনাকে বস্তুনিষ্ঠ পুন:লিখন বা সম্পাদনায় সাহায্য করবে। আপনি নিজে একজন পাঠক হিসাবে গল্পটিকে যদি পাস মার্ক দিতে পারেন তাহলেই ভাবতে পারেন গল্পটিকে পাঠকের কঠিন দরবারে পেশ করার সময় হয়েছে।

আরো কিছু কথকতা, সতর্কতা

যিনি লিখতে চান তাঁর জন্য গুনীজনের প্রথম নসিহত হচ্ছে, লেখালেখি স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই লেখকদের স্বাস্থ্যসচেতন হতেই হবে। আরেক বিপদ আসে লেখার মুড নষ্ট হয়ে। লেখা যেন চলে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। মহান ক্রিকেটার টেন্ডুলকার কিংবা বুমবুম আফ্রিদী বহুবার ফর্ম হারিয়েছেন, কিন্তু কিছুদিন পর ফিরে এসেছেন রাজসিকভাবে। মাঝের সময়টুকুতে তাঁরা নানা কৌশল অবলম্বন করেছেন, নেটে অবিরাম ঘাম ঝরিয়েছেন, নিজের মনের সাথে অনেক বোঝাপড়া করেছেন। পৃথিবীর সকল মহান লেখকের জীবনেও এটা ঘটেছে। তাঁরা লেখার ফর্ম হারিয়েছেন। তাঁরা পরাজয় স্বীকার না করে ফিরে এসেছেন। মাঝের সময়টাতে তাঁরাও নানা কৌশল অবলম্বন করেছেন, পড়ার মাত্রা বাড়িয়েছেন, বেড়াতে গেছেন, মনের সাথে বোঝাপড়ায় নেমেছেন। কেউ কেউ সাহিত্যের যে মাধ্যমে তিনি আগে হাত রাখেননি সে মাধ্যমে কসরৎ করেছেন, কেউ এ সময় অনুবাদে হাত দিয়েছেন। আপনারও লেখার সময় আসতে পারে সে অবস্থা। মনে হতে পারে কিছু হচ্ছে না গল্পের। হাত গুটিয়ে ফেললেন তো লেখক হিসেবে মরে গেলেন। তাই অবস্থা যাই হোক লেখার টেবিলে আপনাকে ঝুলে থাকতেই হবে। টেন্ডুলকার কিংবা আফ্রিদীর পুনর্জন্ম যেমন নেটের আরাধনায় তেমনি আপনারও লেখক পুনর্জন্ম লেখার টেবিলের বন্দনায়। কিন্তু ছোট্ট একটি কথা কানে কানে বলে রাখি, মনের সাথে আপনার এ গোপন যুদ্ধটি লেখকজীবনের সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধগুলোর একটি।

আপনি যখন লিখবেন তখন মনে রাখবেন লেখার সাথে দুটি কাল বা সময়কাঠামো জড়িত। একটি আপনি যে ঘটনা নিয়ে গল্প লিখছেন সে ঘটনা ঘটার কাল। আরেকটি আপনি যখন লিখছেন তার কালপর্ব। দুটি কিন্তু ভিন্ন। তাই সাধারণত গল্পে ব্যবহৃত হয় ক্রিয়াপদের সাধারণ অতীত কালরূপ। যেমন- ’তিথি ঘরে ঢুকলো। ঢুকেই দেখলো সাদীদ শাবাবের হাত থেকে বইটি কেড়ে নিলো।’ এর কারণ লেখক অতীতে কোন এক সময় ঘটে যাওয়া ঘটনাই বর্ণনা করেন। ইংরেজী সাহিত্যে এ কালরূপটিই ব্যবহৃত হচ্ছে প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত। বাংলা কথাসহিত্যে কিংবা মা দাদীর রূপকথার গল্পে ক্রিয়ার এ কালরূপটি প্রধাণত ব্যবহৃত হয়েছে। তবে বাংলা কথাসাহিত্যে সাধারণ অতীত কাল ছাড়াও নিত্যবৃত্ত বর্তমান (সে ঘরে এসে দাঁড়ায়। মিতা তার পাশে এসে বসে।), পুরাঘটিত বর্তমান ( সে বলেছে, সে করেছে।) ও পুরাঘটিত অতীত (সে বলেছিলো, সে করেছিলো।) কালরূপ একক বা মিশ্রিতভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এটা বাংলা ভাষার অনন্যসাধারণ শক্তি আর বাংলা কথাসাহিত্যিকদের অসাধারণ প্রতিভার পরিচায়ক। কিন্তু লেখকদের জন্য এটা বিপদেরও কারণ। ঠিক জায়গায় ঠিক কালরূপ ব্যবহার এবং বিভিন্ন কালরূপের যৌক্তিক ও শিল্পসম্মত ব্যবহার করার বিষয়ে লেখকের প্রতিভা আর তার সচেতনতা দরকার হবে। এর কোন ম্যানুয়াল নেই, ব্যাকরণ নেই, স্বয়ং লেখকই সেখানে পানিণি আর লিওনার্দো দা ভিঞ্চি।

লেখা শুরু করার জন্য কারো কারো মুড আসার দরকার হতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রিয় কোন গান চালু করলে সে গানের আবেশে লেখার মুড চলে আসতে পারে। সোজা লিখতে শুরু না করে গল্পের প্লটটিকে কেন্দ্র করে ছাড়া ছাড়া কয়েকটি বাক্য লিখে শূন্যস্থান পূরণ করতে শুরু করতে পারেন। তাতে লেখার মুড চলে আসতে পারে। এই চেষ্টা বার বার করার দরকার হবে না। কদাচিৎ হতে পারে। তবে এর জন্য মনের ওপর কোন জোর খাটাবার দরকার নেই। কিছু সময়ের জন্য (সেটা কয়েক ঘন্টাও হতে পারে) লেখার টেবিল থেকে দূরে থাকলেই মন তৈরি হয়ে যায়। আরেকটা সতর্কবার্তা এখানে প্রাসঙ্গিক, লেখা থেকে অবচেতন মন যেন অনেক সময়ের জন্য আপনাকে দূরে সরিয়ে না নেয়। মন যখন ফাঁকি দিতে চায় তখন এসব অজুহাত আপনাকে পেয়ে বসতে পারে।

লেখার জন্য মাঝে মাঝে গবেষণার দরকার হয়। আপনি যদি ১৯৫০ সাল বা ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপটে কোনো গল্প লিখতে চান তাহলে ১৯৫০ বা ১৯৭১ সালের পারিবারিক আবহ, পোষাক, স্টাইল, চুলের ফ্যাশন, কথা বলার ঢং, তখনকার পরিপ্রেক্ষিত সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিতে হবে। তা না হলে ভুল তথ্য বা বিষয় গল্পে ঢুকে যাবে। সচেতন পাঠক কিন্তু ভুলটা ধরে ফেলতে পারবেন। তখন পাঠকের শ্রদ্ধা হারাবেন আপনি। এটা লেখকের জন্য খুব বিপজ্জনক।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ’খোয়াবনামা’ উপন্যাসটি বগুড়ার যে এলাকার পটভূমিতে লিখেছেন সে কাতলাহার বিল এলাকায় বছরের পর বছর ঘুরেছেন, বহু লোকের সাথে কথা বলেছেন, গহীন সে এলাকার দোকানে কেনাকাটার সময় মানুষ আর দোকানী কিভাবে কথা বলেন সেটা বোঝার জন্য দোকানের সামনে বসে থেকেছেন, সে এলাকা নিয়ে পড়েছেন বেশুমার (শোনা যায় শত শত খোয়াবনামা কিনেছেন হাটবাজার থেকে), নোট নিয়েছেন বিস্তর, বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষার শুদ্ধতা বজায় রাখার জন্য বারবার বগুড়া গিয়ে স্থানীয় লোকদেরকে দেখিয়ে এনেছেন উপন্যাসের সংলাপ। ইলিয়াসতো মহান লেখক। হ্যারল্ড রবিন্সের মতো বাজার চলতি লেখক বা আর্থার কোনান ডয়েল কিংবা আগাথা ক্রিস্টির মতো থ্রিলার লেখকও ঘটনা বা বিষয়ের সঠিকতা বজায় রাখার জন্য সংশিষ্ট বিষয়ের পেশাদার লোকের পরামর্শ নিয়েছেন।

সচেতনভাবে আপনার নিজস্ব স্টাইল গড়ে নিন। আপনার স্টাইল দিয়ে লোকে আপনাকে চিনবে। রবীন্দ্রনাথ বা টলস্টয় বা মোপাশাকে চিনতে পারবেন তাঁদের নিজস্ব স্টাইল দিয়ে। আমাদের কারো কারো কাছে যেভাবেই মূল্যায়িত হন না কেন হূমায়ুন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন বা সুনীল বা শীর্ষেন্দু, যাঁর কথাই বলুন তাঁরই নিজস্ব একটা স্টাইল কিন্তু আছে। পাঠক সহজেই তা সনাক্ত করতে পারেন। তাই নিয়ম যখন ভাঙতে যাবেন তখনো নিজের নিয়মেই সেটা ভাঙতে ভুলবেন না।

লেখার সময় সতর্কতার সাথে গল্পের চরিত্র, আবহ, পটভূমি, কালপর্ব, গল্পের ধরন ( সামাজিক গল্প না গোয়েন্দা গল্প) ইত্যাদি মনে রেখে লিখবেন। আবারো মনে করাতে চাই, ছোটগল্প কঠিনতম শিল্প মাধ্যমগুলোর একটি। কারণ এখানে বিন্দুতে সিন্ধুকে ফুটিয়ে তুলতে হয়। সাধারণকে করে তুলতে হয় অসাধারণ। লেখার সময় তথ্য, বানান, ব্যাকরণের নিয়ম ইত্যাদি বিষয়ে নির্ভুল থাকার স্বার্থে অভিধানসহ দরকারী বই কাছে রাখার বিষয়ে অলসতা করলে পাঠকের কাছে লজ্জিত ও বর্জিত হবার সম্ভাবনা থাকবে। আকবরের বাবার নাম শেরশাহ লিখলে বা গাঁদা ফুলকে শরতে ফোটালে কিংবা কোকিলকে শ্রাবণে ডাকালে বা অন্য কোন ভুল থাকলে পাঠক আপনাকে অবজ্ঞা করবেন। কখনো ভুলবেন না, সাধারণের পাশাপাশি অনেক অসাধারণ পাঠক থাকেন। বই কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সিরিয়াস এবং নিয়মিত পাঠকরাই পড়েন।

আইডিয়ার কোন কপিরাইট নেই। কিন্তু আইডিয়া কিভাবে প্রকাশ করা হয়েছে সেটা কপিরাইটে পড়ে। অনেকবার অনেক লেখক কর্তৃক ব্যবহৃত আইডিয়া আপনি কিভাবে বলছেন, কোন প্রেক্ষাপটে কোন বক্তব্য তুলে ধরার জন্য আপনি বলছেন সেটাই আপনার নিজস্বতার চি‎হ্ন হয়ে থাকবে।

লেখা চালিয়ে যেতে হবে। অলসতাকে প্রশ্রয় দিলে লেখার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলবেন। অতএব সাবধান। একটু ভিন্নধর্মী গল্প লিখে ফেললে লেখকের মনে অহমিকা চলে আসতে পারে। সেটাও সমান বিপজ্জনক। কারণ অহমিকার জন্য লোকের সাথে গোলমাল বেঁধে যেতে পারে। কারণ এ ভিন্নধর্মিতা আপনার কাছে অনন্য লাগলেও আরেকজনের কাছে তা নাও মনে হতে পারে। সৈয়দ শামসুল হক আমাদেরকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, পাঁচ হাজার বছর ধরে মানুষ রীতিবদ্ধভাবে গল্প রচনা করে আসছেন। কোটি কোটি গল্প লেখা হয়ে গেছে। সম্পূর্ণ নতুন গল্প নির্মান করা এখন অসম্ভব। তার সকল সম্ভাবনা নির্মমভাবে নি:শেষিত। লেখক শুধু কোন বিষয়ে নিজস্ব পর্যবেক্ষণই তুলে ধরেন মাত্র।

এতো কাহিনী করে যে গল্পটি লিখলেন সেটিকে পাঠকের কাছে নেবার জন্য দরকার প্রকাশনা। সেটা হতে পারে সাহিত্য সাময়িকী বা দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যের পাতা অথবা বই। গোলমাল লাগে সেখানে। আপনার গল্পটি সাহিত্য সম্পাদক কিংবা প্রকাশকের নির্মম অবহেলার শিকার হতে পারে। হতে পারে সম্পাদক বা প্রকাশক ভুলভাবে মূল্যায়ণ করেছেন আপনার অমর গল্পটিকে। আবার হতে পারে তাঁরা ঠিকভাবেই ধরেছেন গল্পটি আসলে মানের মাপকাঠিতে ফেল মেরে গেছে যা আপনার চোখে পড়ছে না। কারণ সব মায়ের কাছেই তার সন্তান সোনার চাঁদ। লেখা প্রকাশে নির্মম অবহেলা চিরকালই সাহিত্য চর্চারই অংশ। এটা লেখক বা শিল্পী হয়ে উঠতে প্রেরণার উৎস হতে পারে। প্রত্যাখ্যানের জন্য কখনো হাল ছাড়বেন না। হাল ছাড়লে কি হতে পারতো তার দুএকটি উদাহরণ পেশ করছি।

উইলিয়াম গোল্ডিং তাঁর ’লর্ড অব দা ফ্লাইজ’ উপন্যাসটি প্রকাশের জন্য প্রায় দুই ডজন প্রকাশকের কাছে নির্মমভাবে তাড়া খেয়ে ফিরে এসে পাণ্ডুলিপি পুড়ে ফেলার জন্য আগুনের ইন্তেজাম করে তা সেখানে ফেলেছিলেন। তাঁর স্ত্রীর ত্বরিৎ হস্তক্ষেপে পাণ্ডুলিপিটি বেঁচে যায়। পরে বইটি প্রকাশিত হয় এবং ১৯৮৩ সালে বইটির জন্য গোল্ডিং নোবেল পুরস্কার পান।

এডগার রাইস বারোজ তাঁর উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। নামমাত্র সম্মানীতেও কেউ জঙ্গলের সে আজিব কাহিনী ছাপতে রাজী হননি। বারোজ হতাশ হলে সারা দুনিয়া কাঁপানো ’টারজানে’র কি গতি হতো ভাবতে পারেন ?

আগুনে মুখের একটা অংশ পুড়ে গেছে, চেহারায় নেই আহামরি কিছু। এমন একজন যদি একটি চিত্রনাট্য লিখে তাতে নায়ক হবার বায়না ধরে পরিচালকের কাছে যান তাহলে যে জবাব মেলা স্বাভাবিক, সে জবাবই তিনি পেয়েছেন অনেক পরিচালকের কাছে। তাঁরা শুধু প্রত্যাখ্যানই করেননি। তাঁকে কোন একটা কাজে মন দিয়ে জীবনধারণের পরামর্শও দিয়েছেন। সেই নায়ক হবার স্বপ্নবান হাল ছেড়ে দিলে আমরা কি ’র‌্যাম্বো’র মতো দুনিয়া কাঁপানো মুভি পেতাম ? ঠিকই ধরেছেন, সেই মুখপোড়া নায়ক প্রবরের নাম সিলভিস্টার স্ট্যালোন এবং তিনিই র‌্যাম্বোর কাহিনীকার কাম চিত্রনাট্যকার। তাই সুমনের গানের কলিতেই বলি, হাল ছেড়ো না বন্ধু। কারণ আপনি কি নিশ্চিত জানেন যে, আপনি আগামী দিনের গোল্ডিং বা বারোজ কিংবা স্ট্যালোন নন ?

শেষ হয়ে হইল না শেষ

গুনীজনেরা বলেন, লেখক হবার গোপন রহস্য তিনটি। এ তিন রহস্য যিনি জানবেন তিনি হয়ে উঠবেন মহান গল্পকার। রহস্য তিনটি হচ্ছে-
১।
অনুশীলন।
২।
অনুশীলন। এবং
৩।
অনুশীলন।

লিখতে লিখতেই লেখা শিখতে হয়। এর কোন বিকল্প নেই।

লেখা শিখবেন কোন স্কুলে ? এর জবাবে গুনীরা বলেন, আপনার আগে যারা লিখে গেছেন তাঁদের স্কুলে। অর্থাৎ তাঁদের লেখা গল্পই আপনার ক্লাসরুম।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

১।
উইকিপিডিয়া।
২।
মার্জিনে মন্তব্য গল্পের কলকব্জা– সৈয়দ শামসুল হক
৩।
এনসাইকোপিডিয়া ব্রিটানিকা
৪।
বাংলাদেশের ছোটগল্প:উত্তরাধিকারের প্রেতি: আহমাদ মোস্তফা
কামাল।
★সংগৃহীত পোষ্ট★

আরো জানুন- (আমাদের ফেসবুকে) এখানে click করুন